যুব’রা এগিয়ে আসুন, সবুজ জেলা সবুজই থাকবে

উৎপত্তি দু’ হাজার উনিশ খ্রীস্টাব্দে হলেও দু’ হাজার বিশ খ্রীস্টাব্দে করোনা ‘বিষে’ বিপর্যস্ত বিশ্ব। বিশ্বমহামারি হিসেবে আর্বিভুত করোনা ভাইরাস বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত প্রিয় বাংলাদেশেও ‘থাবা’ বসিয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে, পরিস্থিতি খারাপ থেকে খারাপের দিকে যাচ্ছে। দেশে আট মার্চ তারিখে প্রথম শনাক্তের পর ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজিপুর জেলায় করোনা ব্যাপকতা লাভ করতে থাকে। এরপর চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেট অঞ্চল সমুহে বেশি আক্রান্ত হয়। উত্তরের মানুষগুলো তুলনামূলক অনেক ভালো অবস্থানে ছিলাম। কিন্তু ওই অল্প সময়ের মধ্যে উত্তরের বগুড়া জেলায় সংক্রমণ বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। এখন বগুড়া পরিণত হচ্ছে হটস্পট, রাজশাহীতে পরিসর বড় হচ্ছে। আর হুমকীতে আমরা চাঁপাইনবাবগঞ্জবাসী। তবে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এখন পর্যন্ত অনেক অনেক ভালো অবস্থানে রয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যাণ অনুযায়ী, পঁচিশ জুন পর্যন্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাঁচ উপজেলায় মোট শনাক্ত চুরানব্বই জন। সর্বশেষ চব্বিশ জুনের পাঁচজন ধরে। বিশ এপ্রিল প্রথম শনাক্তের পর মোট পয়ষট্টি দিনে এই পরিমাণ মানুষের দেহে ধরা পড়ে করোনা ভাইরাস। করোনা শনাক্ত মানুদের মধ্যে চুয়ান্ন জনের আক্রান্ত পরবর্তী নমুনা পরীক্ষায় ‘নেগেটিভ’ প্রতিবেদন আসায় করোনা মুক্ত হিসেবে তারা চিহ্নিত হয়েছেন। পরীক্ষার প্রতিবেদন হিসেবে চাঁপাইনবাবগঞ্জে এখন চল্লিশ জন করোনা ভাইরাস বহন করছেন।

আম বাগানের শীতল ছায়ায় ঘেরা প্রিয় চাঁপাইনবাববগঞ্জ ছোট্ট জেলা হলেও জনসংখ্যা কিন্ত কম নয়। (নোটঃ জনসংখ্যার পরিমাণটি না উল্লেখ করায় ভালো। সরকারি যে পরিসংখ্যান সেটি দু’ হাজার এগার খ্রীস্টাব্দের। দিনে দিনে অর্থাৎ ন’ বছরেতো জনসংখ্যা অনেক বেড়েছে)। ভূমির বিবেচনায় মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যার এই জেলায় মাত্র চল্লিশ জন শনাক্তকে ইতিবাচকভাবেইতো দেখা যেতে পারে। কিন্তু না, করোনা বিপদ চল্লিশ থেকে চল্লিশ হাজার হতে খুব বেশি সময় নিবে না। সংক্রমণের ধরণ, গতি প্রকৃতি নিয়ে গবেষকরা যেমনভাবে বলছেন তাতে সে কথা বলতেই পারি। এখন পর্যন্ত গবেষণায় পাওয়া, মানুষ থেকে মানুষে ছড়ানো করোনা ভাইরাস দ্রুতই সম্প্রসারিত হচ্ছে। তবে, তা রুখে দিতে পারেন এই মানুষই। প্রয়োজন শুধুই মানুষের সচেতনা, তেমনটাই বলছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানিরা। চাঁপাইনবাবগঞ্জে এপর্যন্ত শনাক্ত চুরানব্বই জনের মধ্যে পরে শনাক্ত পাঁচজন বাদে অর্থাৎ উননব্বই জনের মধ্যে বাহাত্তর জনই হচ্ছেন বাইরের জেলা থেকে করোনা ভাইরাস বহন করে চাঁপাইনবাবগঞ্জে নিয়ে এসেছেন। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজিপুর এমন জেলা থেকে ফিরে আসা বাহাত্তর জনের বাইরে যারা রয়েছেন তারা হচ্ছেন স্বাস্থ্যকর্মী যারা করোনার নমুনা সংগ্রহ ও চিকিৎসাসেবা কাজে ছিলেন, স্বাস্থ্যকর্মীদের পরিবারের সদস্য এবং ক’জন পুলিশ সদস্য। তারাও (পুলিশ) করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় মাঠে কাজ করেছেন। এই বিশ্লেষণটি বলা এই কারণে যে, প্রিয় চাঁপাইনবাবগঞ্জে এই তথ্য অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে করোনা ‘সামাজিকভাবে’ ছড়িয়ে পড়েনি। এখন দেখার বিষয়, পয়ষট্টি দিনেও কেন ‘সামাজিকভাবে’ ছড়াতে পারেনি ‘করোনা’। আপাতত এই সাফাল্যে অনেকেই কাজ করেছেন। প্রশাসনের সদস্যরা তাঁদের প্রশাসনিক জায়গা থেকে কাজ করেছেন। স্বাস্থ্য বিভাগ কাজ করেছে তাদের জায়গা থেকে। পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বেশ তৎপর ছিলেন করোনাকে আটকে রাখতে। সংগতি- অসংগতি তুলে ধরাসহ জনসচেতনতা সৃষ্টিতে গণমাধ্যমকর্মীরা কাজ করেছেন সমানতালে। তবে এটিই কি পুরো চিত্র? না, এই চিত্রের পেছনেও ভিন্ন চিত্র রয়েছে।
আমার দেখা, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় এলাকায় স্ব-উদ্যোগে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন যুবকরা। যুব’দের তৎপরতা মানুষ বাঁচাতে অনেক সহায়ক হয়েছে। যুব সমাজ তারুণ্যের প্রতিক। আর যৌবনই হলো মানবজীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। এই সময়ে মানুষের কল্যাণে দেশের কল্যাণে যেকোনো ত্যাগ স্বীকারে ব্রতি হতে পারেন যুবকরা। তাইতো কবি হেলাল হাফিজ লিখেছেন, ‘...এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়; এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়...’।
বাঙালির অর্জনসমুহ যথা ভাষা থেকে মুক্তি সংগ্রামেও যুবকদের অবদান ছিল অনন্য। স্বাধীন বাংলাদেশে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু’র ‘সোনার ছেলে’ সন্ধানে দেশের যুবসমাজ সাড়া দিয়ে দেশ গঠনেও ভুমিকা রাখেন। যদিও বর্তমানে পারিপার্শ্বিক অবস্থায় মুষ্টিমেয় যুবকের অকল্যাণকর কর্মকাণ্ডের কারণে যুবসমাজ সমালোচিত। তবে তারা সংখ্যায় কম। আমার বিশ্বাস সিংহভাগ যুবকই কল্যাণকামী। আমি যুব সংগঠনের সঙ্গে কাজ করেছি, এক যুগেরও বেশি সময়। দেখেছি, জেলাজুড়ে আমার অনেক সহকর্মী, অনেক চেনা যুবক এই করোনাযুদ্ধে আত্মনিয়োগ করেছেন। সংক্রমিত এলাকা থেকে কোন মানুষ চাঁপাইনবাবগঞ্জে ফিরে আসলেই এলাকায় এলাকায় যুবকরাই তাদের (ফিরে আসাদের) ‘হোম কোয়ারেন্টাইন’ নিশ্চিত করতে তৎপর ছিলেন এবং ‘হোম কোয়ারেন্টাইন’ নিশ্চিতও করিয়েছেন। যেসব এলাকায় ‘হোম কোয়ারেন্টাইন’ নিশ্চিত করতে ঝুঁকি দেখা গেছে সেসব এলাকার যুবকরাই প্রশাসনকে অবহিত করেছেন এবং প্রশাসনকে সহযোগিতা করে ‘হোম কোয়ারেন্টাইন’ নিশ্চিত করিয়েছেন। এলাকায় এলাকায় অবাধ যাতায়াত রোধ করতে যুবকদের কাজ করতে দেখেছি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও তাঁরা ছিলেন বেশ সরব। দেখেছি, কর্মহীন মানুষদের অসহায়ত্বের সময় পাশে দাঁড়াতে। সরকারিভাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ব্যাপক ত্রাণ সহায়তা দিয়েছেন। দীর্ঘ সময়ধরে উপার্জন কমে যাওয়ার পরেও অনেক অনেক মানুষ ক্ষুধার জ্বালা বুঝতে পারেননি। সরকারের এই খাদ্য সহায়তা দেশের ইতিহাসে একটি মাইল ফলক। যদিও আমাদের চাঁপাইনবাবগঞ্জ ছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলায় কিছু ‘চালচোর’কে দেখা গেছে। প্রসঙ্গে আসি, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি যুবকরা ব্যক্তি উদ্যোগে অসহায়দের পাশে দাঁড়িয়েছেন। দেখেছি, করোনাকালে মানুষের পাশাপাশি জীবজন্তুদের অসহায়ত্বেও যুবকরা খাবার তৈরী করে তাদের যোগান দিয়েছেন। একটা যুদ্ধ, এই যুদ্ধে একটা সফল পরিণতির দিকে যাওয়ায় থাকে যোদ্ধাদের লক্ষ্য। প্রাণঘাতি করোনার সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন বিশ্বের নানাপ্রান্তের লক্ষ কোটি মানুষ। লড়ছি আমরাও। যে লড়াইয়ে অংশ নিয়েছে সরকার, প্রশাসন, পেশাজীবিসহ যুবকরা। এখন করোনাযুদ্ধের দামামার মাঝে যুবকদের যুদ্ধজয়ে প্রয়োজন কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আরো মনযোগী হওয়ার সময়। যে লড়াই শুরু হয়েছে তাতেতো আমাদের জিততেই হবে। করোনার আগ্রাসী থাবা থেকে ‘ভালো অবস্থানে’ থাকা প্রিয় চাঁপাইনবাবগঞ্জকে আরো ভালো রাখতে এলাকায় এলাকায় যুবকদের তৎপর হওয়া জরুরি। যেমন তৎপরতা দেখেছিলাম বাংলাদেশে করোনা যুদ্ধের শুরুতেই। করোনায় বিপর্যস্ত বিশ্বের নানাপ্রান্তের গবেষকরা করোনা ভাইরাস থেকে মানুষকে বাঁচাতে বেশ কিছু মত দিয়েছেন। মোটাদাগে তারমধ্যে রয়েছে, করোনা সংক্রমণ রোধ করা যাবে আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হওয়ার পর তাকে নির্দিষ্ট সময় আলাদা করে রাখা। মনে করি, এখানেই যুবকদের বড় ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। যেমনটা শুরুর দিকে করা হয়েছিল। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শনাক্ত ব্যক্তির নাম ঠিকানা স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে সংগ্রহ করে শনাক্ত ব্যক্তি ও তার পরিবারের সদস্যদের জনগণের মাঝে আসা রোধ করলে রোধ হবে করোনা সংক্রমণ। তবে, মনে রাখতে হবে, করোনা আক্রান্ত হওয়া আক্রান্ত ব্যক্তির অপরাধ নয়। তাঁর সঙ্গে মানবিক আচরণ করে সচেতনতা সৃষ্টির মধ্যদিয়ে তাঁকে আলাদা রাখা। করোনা আক্রান্তের সঙ্গে মানবিক আচরণ করার আবারও অনুরোধ রেখেই বলছি, আলাদা রাখার ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিলে প্রশাসনের সহযোগিতা নিতে হবে। এমনকি কঠোরও হতে হবে অসংখ্য মানুষের জন্য। কবি হেলাল হাফিজ যেমনটা বলেছেন, ‘... যদি কেউ ভালবেসে খুনী হতে চান; তাই হয়ে যান; উৎকৃষ্ট সময় কিন্তু আজ বয়ে যায়...’। মানুষ থেকে মানুষে ছড়ানো করোনা ভাইরাস মানুষের দেহে ঢুকে মুখ, নাক ও চোখ দিয়ে। এটা বিশেষজ্ঞরা বলছেন। তাই মাস্ক ব্যবহার খুবই গুরুত্বপুর্ণ। নিজে মাস্ক ব্যবহার করে মানুষকে মাস্ক ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতে যুব’রা ভূমিকা রাখতে পারেন। এই ক্রান্তিকালেও এলাকায় এলাকায় দেখা যায়, শৈশব অতিক্রম করা কিশোররা এবং উঠতি তরুণরা স্বাস্থ্যবিধি না মেনে বেসামাল চলাফেরা করেন। তাঁদের দুরন্তপনা বিপদ ডেকে আনতে পারে। তাদেরও মাস্ক ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতে হবে যুবকদেরই। মানুষের জীবন বাঁচাতে যে জীবিকা, তার জন্য মানুষকে বাইরে বের হতেই হবে। সামাজিক জীব মানুষ বাইরে বের হলেও এক মানুষ থেকে আরেক মানুষ যেন তিন থেকে ছয় ফুট দূরত্বে অবস্থান করেন। যেহেতু উপসর্গ ছাড়াই মানুষের দেহে করোনা ভাইরাস থাকছে। আর আমরা জানতেও পারছিনা কার দেহে করোনা আছে না নেই।
আরেকটি গুরুত্বপুর্ণ কাজে যুব’রা সচেতনাতামূলক কাজ করতে পারেন সেটি হচ্ছে, মানুষকে ঘন ঘন সাবান দিয়ে হাত ধুতে উদ্বুদ্ধ করা। সরকার করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় দেশকে লাল, হলুদ ও সবুজ ভাগে ভাগ করেছে। ভেবে দেখুনতো, কতইনা সুন্দর, সবুজ আমাদের প্রিয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ। যুব’রা একটু সচেষ্ট হলেই চাঁপাইনবাবগঞ্জের বর্তমানে শনাক্ত চল্লিশ থেকে শূন্য দূর হবে। এরপর দূর হবে চার। দেখবেন করোনা পরাজিত হবেই হবে। সবুজ দিয়ে ঘেরা জেলা সবুজই থাকবে।


চাঁপাইনবাবগঞ্জ নিউজ/ শহীদুল হুদা অলক/ ২৭-০৬-২০

,