৪৫ বছর বয়সে এসএসসি পাশ করলেন কাঠমিস্ত্রি নাসিমুল



২০০২ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার পর সংসারের চাপে থমকে গিয়েছিল পড়াশোনা। তবে দমে যাননি চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাটের নাসিমুল হক। দীর্ঘ ২৪ বছর পর, ৪৫ বছর বয়সে এসে পূরণ করলেন তাঁর সেই অধরা স্বপ্ন। ২০২৬ সালের এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় রাজশাহী কমার্স কলেজ থেকে অংশ নিয়ে জিপিএ ৪.৬২ পেয়ে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি।

নাসিমুল হক ভোলাহাট উপজেলার গোহালবাড়ি ইউনিয়নের তিলোকী গ্রামের বাসিন্দা। পেশায় একজন কাঠমিস্ত্রি। পাশাপাশি তিনি ভোলাহাট উপজেলা ফার্নিচার শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদকসহ একাধিক শ্রমিক সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, নাসিমুল ২০০২ সালে ভোলাহাটের বাচ্চা মারী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথমবারের মতো এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু সেবার অকৃতকার্য হওয়ার পর সংসারের হাল ধরতে গিয়ে কাঠমিস্ত্রি হিসেবে কাজ শুরু করতে হয় তাঁকে। ফলে পড়াশোনা আর এগোয়নি।

দীর্ঘদিন কাঠের নকশা ও পেশাগত কাজে ডুবে থাকলেও প্রাতিষ্ঠানিক একটি সনদ অর্জনের আকাঙ্ক্ষা সুপ্ত ছিল তাঁর মনে। পরবর্তীতে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষায় সহায়তাকারী চাঁপাইনবাবগঞ্জের দাতব্য প্রতিষ্ঠান ‘মেধাবিকাশ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিবার’-এর কার্যালয়ে যোগাযোগ করেন তিনি। সংস্থাটির সহায়তায় ও শিক্ষক মাসুদের পরামর্শে তিনি কারিগরি বোর্ডের অধীনে রাজশাহী কমার্স কলেজের ভোকেশনাল শাখায় ভর্তি হন।

তিন সন্তানের জনক নাসিমুল সারাদিনের শারীরিক পরিশ্রম সামলে রাতে নিয়মিত বই-খাতা নিয়ে বসতেন। এমনকি ব্যস্ততার মাঝেও নিয়মিত অনলাইনে ক্লাসে অংশ নিতেন।

নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করে নাসিমুল বলেন, “২০০২ সালে ফেল করার পর পড়ালেখা বন্ধ হলেও মনে একটি প্রাতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেট অর্জনের ইচ্ছা ছিল। সারাদিন কাঠের কাজ সামলে রাতে পড়াশোনা করা সহজ ছিল না। কিন্তু ইচ্ছা থাকলে যে বয়স কোনো বাধা হতে পারে না, তা আজ প্রমাণ হলো। এই অর্জন আমার সন্তানদেরও পড়াশোনায় উৎসাহিত করবে।” এসএসসি পাসের পর তিনি তাঁর এই শিক্ষার পথচলা সামনেও অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

রাজশাহী কমার্স কলেজের প্রভাষক মাসুদ বলেন, “নাসিমুল হকের মূলত একটি প্রাতিষ্ঠানিক সনদের প্রয়োজন ছিল। সংসারের দায়িত্ব ও কাজের শত ব্যস্ততার মাঝেও যেভাবে তিনি ত্যাগ স্বীকার করেছেন এবং নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন—তা সত্যি প্রশংসনীয়। এ বয়সে শিক্ষার প্রতি তাঁর এমন আগ্রহ সত্যিই অনন্য।”

নাসিমুলের এই সাফল্যে উচ্ছ্বসিত তাঁর গ্রাম তিলোকীর বাসিন্দারাও। ভোলাহাট উপজেলা শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি ও সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মো. লোকমান আলী বলেন, সংসারের দায়িত্ব সামলে একজন শ্রমজীবী মানুষ যে ৪৫ বছর বয়সেও এমন ভালো ফল করতে পারেন, নাসিমুল তা দেখিয়ে দিয়েছেন। আমরা তাঁর এই অর্জনে অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত।”

চাঁপাইনবাবগঞ্জ নিউজ / নিজস্ব প্রতিবেদক / ১০ আগষ্ট ২০২৬